কুকুর বলতে মানুষের সেরা বন্ধু বোঝাই
সমাজে কুকুর হিসেবে পরিচিত হওয়া
ছাড়াও এরা মানুষের প্রকৃত বন্ধু হিসাবে ও বিশেষ পরিচিত পাই। বৈজ্ঞানিক ভাবে সর্বপ্রথম কুকুর প্রজাতি উৎপত্তি ঘটে ক্যানিস লুপাস ফেমিলিয়ারিস নামক নেকড়ের প্রজাতির থেকে। যা বর্তমানে মানব সমাজে গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে পরিচিত পাই বা জানা যায়। প্রথম কুকুর প্রজাতি যা মানব
সমাজে গৃহপালিত প্রাণী হিসাবে জানা যায়। এরা হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের
সঙ্গী, বাধ্য পোষা প্রাণী, রক্ষক এবং শ্রমিক হিসাবে কাজ করছে। উৎপত্তি থেকে শুরু করে সম্প্রতি কালে কুকুরের ভূমিকা কতটা অপরিহার্য তা নীচে এই বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করা হলো-
কুকুরের ইতিহাস:-কুকুরের ইতিহাস (ক্যানিস লুপাস ফেমিলিয়ারিস) মানুষের ইতিহাসের সাথে জড়িত, হাজার হাজার বছর আগে থেকে গৃহপালিতপ্রাণী হয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়।
আদিম গৃহপালিত প্রাণী
উত্স ও পারস্পরিক সুবিধা:- কুকুর হল ক্যানিস লুপাস নামক এক নেকড়ের বংশধর। জেনেটিক গবেষণায় দেখা যায় যে মানব সমাজে কুকুরকে প্রথম গৃহপালিত প্রাণী হিসাবে ব্যবহার করা হয় প্রস্তর যুগ থেকে। যে যুগে মানব সমাজ আগুনের ব্যবহার, গুহাচিত্র, থেকে শুরু করে শিকার ও সংগ্রাহক জীবনযাপন করত। আর সেই যুগে মানুষ শিকার ধরতে এবং রাতে বন্য প্রাণীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য কুকুর কে প্রহরী বা রক্ষক হিসাবে ব্যবহার করত।
প্রাচীন সংস্কৃতিতে কুকুর
প্রাচীন সংস্কৃতিতে কুকুরকে বিশেষভাবে সম্মান এবং গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হত। এখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতি সম্পর্কে তথ্য দেওয়া হল:- মিশর, গ্রীস এবং রোম।
- মিশর:- (প্রাচীন মিশরীয় সংস্কৃতিতে কুকুর খুব সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব ৩১০০-২৬৮৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি সময় থেকে লক্ষ করা যায়) প্রাচীন মিশরে কুকুরের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত দেবতা আনুবিস-এর সাথে। এই বার তোমাদের অনেকের মনে একটা প্রশ্ন আসতে পারে যে, এই আনুবিস কে বা কী? প্রাচীন মিশরের একাধিক দেবতাদের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন- রা (God of Sun), নুট (Goddess of Earth), আইসিস (Goddess of Motherhood), ওসাইরিস (God of Justice), হাথার (Goddess of Drunkenness), হোরাস (God of Sky), এমুন (THE CREATOR GOD)। ঠিক এদের মতোই একজন দেবতা হল আনুবিস (GOD OF DEATH)। মানুষের দেহ এবং শেয়ালের মতো মাথা বিশিষ্ট আনুবিসকে ভাবা হতো মৃতদের রক্ষাকারী দেবতা, যিনি শব সংরক্ষণ এবং মমি প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রাচীন মিশরে প্রায় শেয়ালদের দেখা যেত কবরস্থান থেকে মৃত দেহ তুলে তারা খেতো। আর এখান থেকে আনুবিসের শেয়াল মতো মাথার ধারণাটি এসেছে বলে মনে করা হয়। প্রাচীন মিশরীয় রাজাদের দেহ মমি করনের সাথে যুক্ত পুরোহিতরাও আনুবিসের অনুকরণে মুখোশ পড়তেন। তাছাড়া আনুবিসের মাথাটি শেয়ালের মতো হওয়ায়, কুকুর ও শেয়ালের প্রতি মিশরীয়দের বিশেষ সম্মান ছিল।
- গ্রীস এবং রোম:- ( সাধারণভাবে, প্রাচীন গ্রীস এবং রোমের সংস্কৃতিতে কুকুরের ভূমিকা খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে ৪৭৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি সময় থেকে লক্ষ করা যায়) প্রাচীন গ্রীস ও রোমে কুকুকে দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হত। যেমন- শিকার করার, সুরক্ষা প্রদান, যুদ্ধ ক্ষেত্রে সৈনিক এবং সঙ্গী হিসাবে ব্যবহার করা হত। এছাড়াও প্রাচীন গ্রীস ও রোমে কুকুকে দেবতা হিসেবে পুজো করা হত। এখন তোমাদের মনে একটি প্রশ্ন জাগতে পারে যে, প্রাচীন গ্রীস ও রোমের মানুষরা কুকুরকে কেন দেবতা হিসেবে পুজো করত? প্রাচীন গ্রীস ও রোমের ধর্ম বা সাংস্কৃতির সাথে কুকুরা অবগত ছিল। যেমন তোমরা উপরে মিশরে কুকুরের ভূমিকা পড়ছো, তেমনই গ্রীক ও রোমের পৌরাণিক কাহিনীতেও কুকুরদের বিশেষ স্থান ছিল। গ্রীক দেবতা হেডিস এর কুকুর ছিল সার্বেরাস, যার শারীরিক বৈশিষ্ট্য অন্য কুকুরদের থেকে একটু আলাদা ছিল। কারণ আমরা সাধারণত কুকুরকে একটি মাথা বিশিষ্ট দেখতে পাই, কিন্তু হেডিসের কুকুর সার্বেরাসের তিন মাথা ছিল বলে জানা গিয়েছে। এছাড়াও এই তিন মাথা বৈশিষ্ট্য সার্বেরাস মৃত্যুর প্রতীক, আত্মার প্রতিরক্ষক এবং মৃত্যুর পরবর্তী জগতের দরজা প্রহরী রূপে কাজ করত। এছাড়াও রোমের বাসিন্দারা-বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে কুকুরকে ধর্মীয় দেবী হেকাটে (রোমান যাদুবিদ্যা ও মৃতদের রক্ষাকারী দেবী) সঙ্গী বা বাহন হিসাবে দেখা যেত। আর এই জন্যই কুকুরের প্রতি গ্রীস এবং রোমানদের বিশেষ সম্মান ছিল।
-
- উপসংহার:-প্রাচীন মিশর, গ্রীস এবং রোমে কুকুরের প্রতি মানুষের বিশেষ ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা ছিল। শুধু দৈনন্দিন কাজে নয়, ধর্মীয় আচার, পৌরাণিক কাহিনি এবং দেবতাদের সাথে কুকুরের বিশেষ সম্পর্ক ছিল। প্রাচীন মিশরে কুকুর ছিল আনুবিস দেবতার প্রতীক, যিনি শেয়ালের মতো মাথা নিয়ে মৃতদের রক্ষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রাচীন গ্রীস ও রোমে কুকুরকে শুধুমাত্র সঙ্গী বা প্রহরী হিসেবে নয়, বরং দেবতা হেডিসের সার্বেরাস বা দেবী হেকাটের সহচর হিসেবে পূজা করা হতো। এইসব প্রাচীন সভ্যতায় কুকুরের ভূমিকা ধর্ম, সুরক্ষা, এবং মানুষের সঙ্গী হিসেবে বিশিষ্ট ছিল, যা প্রাচীন কালের মানুষদের দৈনন্দিন জীবন এবং বিশ্বাসে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। এটা ছিল কুকুরের সম্নান, ব্যবহার ও প্রাচীন সংস্কৃতি সাথে যুক্ত কিছু ইতিহাসের কাহিনী। এবার চলো জেনে নিই আধুনিক যুগের কুকুরের ভূমিকা কতটা।
আধুনিক যুগে কুকুরের ভূমিকা
আধুনিক যুগে মানব সমাজে বিভিন্নভাবে বা বিভিন্নকাজে কুকুরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেমন- নিরাপত্তা ও সুরক্ষায়, প্রতিবন্ধী সহায়তার, থেরাপি ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার, স্বাস্থ্য সনাক্তকরণে, উদ্ধার ও অনুসন্ধানে, বন্য প্রাণী সংরক্ষণে, বন্ধুত্ব, পারিবারিক সঙ্গী, শিশুদের বিকাশ, বিনোদনে, এবং গবেষণা ও ঘ্রাণ বিশ্লেষণে কুকুর বিশেষ ভূমিকা নিয়ে থাকে। চলো এবার উপরের এই বিষয় গুলিকে আরও বিস্তারিত ভাবে জেনে নেওয়া যাক-
নিরাপত্তা ও সুরক্ষা:- প্রথমত পুলিশ ব্যবহার করে অপরাধী বা সন্দেহভাজনক লোকদের সনাক্তকরণের প্রশিক্ষিত করে অপরাধীদের আটোক করতে সাহায্য করে কুকুর। পুলিশ বিভাগের জন্য কুকুর একটি জরুরি অংশ, কারণ কুকুরের ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, যার কারণে তারা মাদক, অস্ত্র, এবং বিস্ফোরকের গন্ধ সনাক্ত করে দ্রুত অপরাধীদের খুঁজে বের করতে সক্ষম। তাছাড়া সাংবাদিক ও ভিআইপি নিরাপত্তা (কুকুরকে মাননীয় ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয়), বাড়ির সুরক্ষা (তারা বাড়ির আশেপাশে অপরিচিত মানুষের উপস্থিতি বুঝতে পারে এবং বিপদের আভাস পেলে শব্দ করে সবাইকে সচেতন করে), ভিড় ব্যবস্থাপনায় (কুকুরদের কিছু বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে ছাগল, গরু, ভেড়া, দল নিয়ন্ত্রণ করে মাঠে চড়াতে সাহায্য করে)। এছাড়াও বিশেষ করে বড় অনুষ্ঠান, কনসার্ট বা খেলার সময় তারা নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে সাহায্য করে, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, সাইবার ও ডিজিটাল নিরাপত্তা (কিছু প্রশিক্ষিত কুকুর ডিভাইসে লুকিয়ে থাকা হার্ডডিস্ক, ইউএসবি, খুঁজে বের করতে পারে। যা সাইবার অপরাধ তদন্তে সাহায্য করে), এবং সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় রাখতে কুকুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রতিবন্ধী সহায়ক:-আধুনিক যুগে যে সব মানুষ শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী সম্পূর্ণ ব্যক্তিদের দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজে কুকুরের গুরুত্বপূর্ণ দিক বা ভূমিকা হলো, যেমন- দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের সহায়তা, (দৃষ্টিশক্তি হারানো বা যারা চোখে দেখতে পাই না তাদের রাস্তা পারাপার, বাধা এড়ানো, নিরাপদে চলাচলের, এবং পথপ্রদর্শক, হিসাবে কাজ করে এই কুকুর), শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের সহায়তা, (শ্রবণশক্তি হারানো বা যারা কানে শুনতে পাই না সেই সব মানুষের শোনার কাজ করে এই কুকুর, যেমন দরজার ঘণ্টা, আগুনের বিপদ সংকেত, ফোন কল, শিশুর কান্নার, মতো শব্দগুলো সচেতন বা শনাক্ত করতে সাহায্য করে কুকুর), মৃগী রোগীদের জন্য সহায়ক, পশ্চিমবঙ্গে এই রোগটির ইংরেজিতে "এপিলেপসি" নামে পরিচিত, আর মৃগী শব্দটি এসেছে হরিণ থেকে, কারণ সংস্কৃত শব্দতে হরিণকে মৃগ বলা হয়, আর এই মৃগ শব্দ থেকে মৃগী রোগের নাম এসেছে। কয়েকটি প্রশিক্ষিত কুকুর এই মৃগী রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগে লক্ষণ বুঝতে পারে, এবং পরিবার বা আশেপাশের লোকজনকে দ্রুত সচেতন করে। মৃগী রোগের কয়েকটি লক্ষণ- হঠাৎ খিঁচুনি "শরীরের পেশিগুলি শক্ত বা ঢিলা হয়ে যাওয়া এবং মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ঝাঁকি শুরু হওয়া", অজ্ঞান হয়ে পড়া ও দৃষ্টিভ্রম বা বিভ্রান্তি "অনেক রোগীর খিঁচুনির আগে বা পরে বিভ্রান্তি, বিশৃঙ্খলা মূলক কথা বলা বা অস্বাভাবিক ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়"। মৃগী নিয়ন্ত্রণযোগ্য হলেও, এটি সম্পূর্ণভাবে ভালো করা সম্ভব। এভাবে কুকুররা প্রতিবন্ধী মানুষদের স্বাভাবিক জীবন যাপনে সাহায্য করে এবং তাদের মানসিক ও শারীরিক ক্ষমতা বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
থেরাপি ও মানসিক সহায়তা:- থেরাপি শব্দটি আধুনিক ব্যবহার শুরু হয় ১৮৫০-এর দশকে। আর ইংরেজি ভাষায় থেরাপি শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয় ১৮৪৬ সালে। শব্দটি গ্রিক শব্দ থেরাপেইয়া থেকে এসেছে, যার অর্থ চিকিৎসা বা সেবা প্রদান করা। আর এই শব্দটি প্রথমবার ব্যবহার করে প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস। এবার চলো জেনে নেওয়া যাক, আধুনিক যুগে মানুষের থেরাপি ও মানসিক সহায়তায় কুকুরের ভূমিকা কতটা? আধুনিক যুগে মানুষের থেরাপিতে ও মানসিক স্বাস্থ্য বজায় রাখাতে কুকুরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে, থেরাপি ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য, কুকুররা বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত হয়ে মানুষের জীবনের দ্রুত পরিবর্তনে সাহায্য করে। কর্মজীবনের চাপ, ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা, এবং অন্যান্য কারণের জন্য মানুষ যখন একাকৃত, মনমরা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, ভাঙ্গা মন বা প্রিয় মানুষের কাছ থেকে ধোকা খেয়ে বিভ্রান্তি হয়ে। মানুষ যখন নিজেকে অসহায় মনে করে, তখন কুকুর মানুষের একমাত্র সঙ্গী হয়ে মানসিক একাকীত্বতা ও বিভ্রান্তি দূর করতে সাহায্য করে।
স্বাস্থ্য সনাক্তকরণ:- আধুনিক যুগে মানুষের স্বাস্থ্য সনাক্তকরণে কুকুরের তীক্ষ্ণ ঘ্রাণশক্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। কারণ প্রশিক্ষিত কুকুরেরা তাদের তীক্ষ্ণ ঘ্রাণশক্তি এবং চৌকসতা দিয়ে স্বাস্থ্যের বিভিন্ন জটিল রোগের লক্ষণ সনাক্ত করতে সক্ষম। যেমন- ক্যানসার সনাক্তকরণ " কুকুর মানুষের মূত্র, শ্বাস, রক্ত, বা ঘামের গন্ধ বিশ্লেষণ করে ফুসফুস, স্তন, প্রোস্টেট, ও ত্বকের ক্যানসারের উপস্থিতি বুঝতে পারে। এছাড়াও গবেষণায় দেখা গেছে, প্রশিক্ষিত কুকুর ৯৭% পর্যন্ত সঠিকভাবে ক্যানসার শনাক্ত করতে সক্ষম।", ডায়াবেটিস রোগীদের সহায়তা "বিশেষ করে টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এই কুকুরগুলো এলার্ট ডগ নামে পরিচিত, প্রশিক্ষিত কুকুরেরা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রার পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারে। যখন গ্লুকোজের মাত্রা অত্যধিক কমে (হাইপোগ্লাইসেমিয়া) বা বেড়ে যায় (হাইপারগ্লাইসেমিয়া), তখন তারা মালিককে সতর্ক করে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জীবনরক্ষায় সহায়ক।", মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা "তারা খিঁচুনি শুরু হওয়ার আগে রোগীর শরীরে রাসায়নিক পরিবর্তন বা গন্ধ সনাক্ত করতে পারে এবং আগে থেকেই সতর্ক করে রোগীদের মৃগী রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগে স্বাভাবিক অবস্থায় চলে যেতে সাহায্য করে।", এবং সংক্রামক রোগ সনাক্তকরণ"সাম্প্রতিক বছরগুলোতে COVID-19 মহামারির সময় গবেষণা থেকে জানা গেছে, কুকুর প্রশিক্ষণ নিয়ে সংক্রমিত ব্যক্তিদের গন্ধ শনাক্ত করতে পারে। এছাড়া ম্যালেরিয়া, টিউবারকুলোসিস (যক্ষ্মা) এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগ শনাক্ত করতেও তাদের ব্যবহার করা হয়।",
উদ্ধার ও অনুসন্ধান:-আধুনিক যুগে উদ্ধার ও অনুসন্ধানে কুকুর মানুষের জীবনে অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাদের তীক্ষ্ণ ঘ্রাণশক্তি, প্রশিক্ষণ গ্রহণের অসাধারণ ক্ষমতা এবং মানুষের প্রতি বিশ্বস্ততা দুর্যোগ বা সংকটময় পরিস্থিতিতে তাদের অমূল্য সঙ্গী করে তুলেছে। যেমন- ভূমিকম্প, ভূমিধস, ধ্বংসস্তূপে, গভীরে মানুষের উপস্থিতি বা জীবনের লক্ষণ তারা তাদের ঘ্রাণশক্তি দিয়ে নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করতে পারে, যা উদ্ধার অভিযানে সময় ও পরিশ্রম সাশ্রয় করে এবং প্রাণহানির ঝুঁকি কমায়। এছাড়া তুষারপাত বা পাহাড়ি এলাকায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানেও কুকুর অত্যন্ত কার্যকর। এবং অপরাধ তদন্তে, বোমা বা বিস্ফোরক, সীমান্ত এলাকায় মানবপাচার রোধ, শরণার্থী উদ্ধার এবং অবৈধ কার্যকলাপ শনাক্ত করতে কুকুর অসাধারণ ভূমিকা পালন করে। উদ্ধার ও অনুসন্ধানে কুকুরের অবদান শুধু শারীরিক দক্ষতার জন্য নয়, বরং তাদের মনোবল, সাহসিকতা এবং মানুষের প্রতি অটুট বিশ্বস্ততার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক যুগে এই প্রাণীদের ভূমিকা মানবজীবন রক্ষায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে এবং ভবিষ্যতে এই অবদান আরও বিস্তৃত হবে বলে আশা করা যায়।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ :-আধুনিক যুগে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কুকুরের ভূমিকা কেবল প্রশংসনীয়ই নয়, বরং প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। বন্যপ্রাণী রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে তারা মানুষের এক বিশ্বস্ত সহযোগী। এছাড়া প্রশিক্ষিত কুকুর তাদের প্রখর ঘ্রাণশক্তি, সতর্কতা এবং মানব পরিজন স্বভাবের মাধ্যমে এমন অনেক কাজের অবদান রেখেছে যা অন্য পদ্ধতিতে প্রায় অসম্ভব। যেমন- বন্যপ্রাণী পাচার রোধ, হাতির দাঁত, বাঘের চামড়া, গণ্ডারের শিং, এবং বিভিন্ন প্রাণীর পাচারকৃত পণ্য সনাক্ত করতে সক্ষম। এসব পণ্যদ্রব্য গুলি পাচারকারীরা লুকিয়ে সীমান্ত এলাকা, বন্দর, বিমানবন্দর, এর মধ্যেমে, পরিবহন করে, এক জায়গা থেকে অন্য জাগায় নিয়ে যায়, কিন্তু কুকুরের তীক্ষ্ণ ঘ্রাণশক্তি তা সহজেই ধরে ফেলে। এভাবে তারা পাচার বন্ধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে এবং অবৈধ শিকারিদের চক্রকে দুর্বল করে। এছাড়া অনেক বন্যপ্রাণী প্রজাতির বিলুপ্তির পথে, তাদের সুরক্ষার জন্য সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি। এই সব সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে কুকুর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এরা একটি নির্দিষ্ট প্রাণীর মল, প্রস্রাব বা অন্যান্য গন্ধ শনাক্ত করে তাদের অবস্থান ও সংখ্যা নির্ধারণ করতে সাহায্য করে, আর এই ডেটা ব্যবহার করে গবেষকরা প্রাণীদের বাসস্থান সংরক্ষণ এবং পুনর্বাসনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন। এছাড়াও বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি মোকাবেলায়, সংক্রমক রোগে আক্রান্ত কিনা সনাক্তকরণে, মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে সংঘাত কমিয়ে আনতেও কুকুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুধু তাই নয়, কুকুর নিয়মিত টহল দিয়ে বন্যপ্রাণীদের দূরে রাখতে এবং মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। এভাবে কুকুর তার কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান তৈরি করে। পরিশেষে বলা যায় আধুনিক যুগে কুকুর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে এক গভীর সংযোগ তৈরি করেছে, যা আমাদের পৃথিবীকে আরও সুন্দর ও সুরক্ষিত করে তুলেছে।
বন্ধু, পারিবারিক সঙ্গী, শিশুদের বিকাশ, খেলাধুলা এবং বিনোদনে, কুকুরের ভূমিকা :- আমরা উপরে পড়েছি প্রস্তর যুগ থেকে মানুষের জীবনে কুকুরের অবদান কতটা, তেমনি আধুলিক যুগে মানুষের জীবনে কুকুরের অবদান বহুমাত্রিক - প্রথমত প্রাণীদের মধ্যে মানুষের বিশ্বস্ত বন্ধু হিসাবে কুকুরকে জানা যায়, তারা তাদের মালিকে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবাসে ও বিশ্বাস যোগ্য হয়, যা মানুষের জীবনে মানসিক শান্তি ও উল্লাস নিয়ে আসে। পরিবারে কুকুর আর পাঁচ জন মানুষের মত একজন সদস্য হয়ে ওঠে। কিন্তু তোমরা অনেকে প্রশ্ন করতে পারো একটি পরিবারে কুকুরের কাজ কি ? একটি পরিবারে কুকুরের কাজ হল - বাড়ির নিরাপত্তার দায়িত্ব, বুড়োদের সাথে সকালে হাটতে যাওয়া, বড়দের সাথে দৌড়ানো, ছোটো সাথে বল নিয়ে খেলা,সাঁতার, দৌড়ঝাঁপের সাথে সাথে শিশুদের আত্মবিশ্বাসও বাড়ায়, বিভিন্ন কৌশল মাধ্যমে পরিবারের সকল সদস্যদের আনন্দ উল্লাসে একত্রিত করে।এছাড়াও বিষণ্ণতা ভোগা মানুষ কুকুরের সংস্পর্শে আসলে মানসিক বিরাম খুঁজে পায়।এই জন্য সব প্রাণীদের মধ্যে কুকুরকে মানুষের প্রকৃত বন্ধু হিসাবে জানা যাজাই বা মনে করা হয়।
0 Comments